|
Getting your Trinity Audio player ready...
|
Apnarbangla Newsdesk: ধর্মশালার হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামকে ঘিরে আজ পাহাড়ি শীত, কুয়াশা আর উচ্ছ্বাস-সব মিলিয়ে ছিল বিশেষ এক শিহরণ জাগানো সন্ধ্যা। তুষারঢাকা ধৌলাধার পাহাড়ের পটভূমিতে যখন আলো জ্বলে উঠল, তখনই পরিষ্কার হয়ে গেল, ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকার তৃতীয় টি-২০ শুধু সিরিজ লিডের (IND vs SA) লড়াই নয়, বিশ্বকাপের আগে মানসিক দাপট প্রতিষ্ঠার যুদ্ধও। এই যুদ্ধই বলে দেবে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। মুলানপুরে ৫১ রানে হারটা ভারতীয় ড্রেসিংরুমে বড় ধাক্কা দিয়ে গিয়েছিল, আর ঠিক সেই স্মৃতি নিয়েই দল নামল ধর্মশালায় প্রত্যাবর্তনের মিশনে বা লক্ষ্যে । অন্যদিকে, প্রোটিয়ারা এই ট্যুরে টেস্ট-ওয়ানডে-টি২০—সব ফরম্যাট মিলিয়ে ধারাবাহিক লড়াইয়ে যে মানসিক বেঞ্চমার্ক তৈরি করেছে, সেটাকে আরও উঁচুতে তুলতে চাইছিল। যার ফলে লড়াই যে জমজমাট হবে সেটা বোঝা যাচ্ছিল।
টস, কৌশল আর প্রথম ধাক্কা
সন্ধ্যার ঠান্ডা আর সুইং–সহায়ক পরিবেশ মাথায় রেখে সুর্যকুমার যাদব টস জিতে প্রথমে বোলিং নেন, যা স্পষ্ট সংকেত দিয়ে দেয় যে-মুলানপুরের ব্যর্থ রানচেজ ভুলে এবার বোলারদের হাতেই ম্যাচ গড়ার দায়িত্ব। সিদ্ধান্তটা যে কতটা সঠিক ছিল, তার ইঙ্গিত মেলে প্রথম কয়েক ওভারেই। ভালো ফল করে টিম ইন্ডিয়া।নতুন বল হাতে আর্সদীপ সিং শুরুতেই রিজা হেন্ড্রিকসকে ফিরিয়ে ভারতে স্বস্তির প্রথম নিশ্বাস এনে দেন। অন্য প্রান্তে তরুণ হর্ষিত রানা যেন নিজেকে প্রমাণের তাগিদে আগুন ঝরাচ্ছেন-একই স্পেলে কোয়েন্টন ডি কক আর ডেওয়াল্ড ব্রেভিসকে আউট করে প্রোটিয়া টপ–অর্ডারের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। এই ভাবেই সুন্দর সূচনা করে টিম ইন্ডিয়া।
প্যান্ডিয়ার সেঞ্চুরি মাইলফলক, মার্করামের একার লড়াই
মাঝে এসে দলে অভিজ্ঞতার প্রতীক হার্দিক পাণ্ডিয়া নিজের স্পেলে তুলে নেন ট্রিস্টান স্টাবসের উইকেট, আর সেই সঙ্গে স্পর্শ করেন আন্তর্জাতিক টি-২০তে ১০০ উইকেটের বিশেষ মাইলফলক। এই ব্রেকথ্রু-র পরই দক্ষিণ আফ্রিকা কার্যত চাপে ভেঙে পড়তে শুরু করে, আর ড্রেসিংরুমের গ্যালারিতে ভারতীয় সাপোর্ট স্টাফদের মুখে দেখা যায় স্বস্তির হাসি। তিরঙ্গা পতাকা উড়তে দেখা যায়।এই ধসের মাঝেও একা লড়াই চালিয়ে যান অধিনায়ক আইডেন মার্করাম। ঠান্ডা আবহাওয়া, মুভিং বল আর চারপাশ থেকে পড়তে থাকা উইকেট-সব কিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করে তাঁর ফিফটির কাছাকাছি পৌঁছনো ইনিংসটা শুধু স্কোরবোর্ডই বাঁচায়নি, প্রোটিয়া ডাগআউটকেও মানসম্মান বাঁচানোর মতো কিছু দিয়েছে। আইডেন মার্ক রামের এই লড়াই ক্রিকেট ইতিহাস অনেক দিন মনে রাখবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসের পতন
টপ অর্ডার ভেঙে দেওয়ার পর স্পিনে দায়িত্ব নেন বরুণ চক্রবর্তী ও কুলদীপ যাদব, আর তাদের টাইট লাইন–লেংথে মাঝ–অর্ডারের রানআশা কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ ওভারেই দক্ষিণ আফ্রিকা গুটিয়ে যায় মাত্র ১১৭ রানে। যার ফলে ম্যাচ সহজ হবে অনেকেই মনে করছিলেন।এই স্কোর ধর্মশালার ছোট বাউন্ডারি আর উচ্চ সমতলের পাতলা বাতাসের মানদণ্ডে স্পষ্টতই কম, যেখানে সামান্য মিস-টাইমড শটও মাঝে মাঝে বাউন্ডারি টপকে যায়। ডাগআউটে তখন ভারতীয় বোলারদের কাঁধ জড়িয়ে ধরার উৎসব, আর স্ট্যান্ডে “ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া” স্লোগান আরও জোরে ধ্বনিত হতে শুরু করে।
ভারতীয় ওপেনিং ও টপ–অর্ডারের মান–পরীক্ষা
মাত্র ১১৮ রানের লক্ষ্য দেখতে সহজ, কিন্তু মুলানপুরের অভিজ্ঞতা এখনও তাজা, তাই শুরুটা কীভাবে হয়, সেদিকেই চোখ ছিল সবার। শুভমান গিল আর অভিষেক শর্মার জুটি সেখানেই ভারতীয় ভক্তদের আশা ধরে রাখে। পাওয়ারপ্লেতে ঝুঁকি আর সংযমের নিখুঁত মিশেলে খেলে স্কোরবোর্ডকে স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী এগিয়ে নিয়ে যায়। এভাবেই জয়ের ভিত গড়ে দেন তারা।গিল নিজের ন্যাচারাল গেমে কভার ড্রাইভ আর পুলে বাউন্ডারি খুঁজতে থাকেন, আর অভিষেক (Abhishek sharma) শুরু থেকেই শটের বৈচিত্র্যে প্রোটিয়া পেস আক্রমণকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেন। অভিষেক প্রয়োজনীয় ক্যামিওর পর আউট হলেও তখন পর্যন্ত ম্যাচের সমীকরণ প্রায় একতরফা হয়ে গেছে, আর ডাগআউটে দাঁড়িয়ে কোচিং স্টাফদের মুখে দেখা যায় স্বস্তি ও তৃপ্তি।
মাঝেই ভরসা তিলকের ব্যাটে
প্রথম উইকেট পড়ার পর নেমে তিলক বর্মা আবার প্রমাণ করেন, কেন বর্তমান ভারতীয় টি–২০ দলে তিনি মাঝ–অর্ডারের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম। এর আগে তার একার লড়াই ব্যর্থ হলেও, ধর্মশালায় তিনি স্কোরবোর্ড, পিচ আর পরিস্থিতি নিখুঁতভাবে পড়ে নির্ভার ক্রিকেট খেলেনগিল–তিলক জুটি মিলে গ্যাপ খুঁজে স্ট্রাইক রোটেট করতে করতে দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের সব পরিকল্পনাই ভেস্তে দেন। বড় শট তখনও এসেছে, কিন্তু বিপদের দরজা খোলার মতো অযথা ঝুঁকি নেননি কেউই,ঠিক এই পরিণতিটাই ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট দেখতে চাইছিল এই সিরিজের মাঝপথে।
সিরিজের প্রেক্ষাপটে এই জয়
এই জয়ের মাধ্যমে ভারত সিরিজে ২–১ এগিয়ে গিয়ে শুধু স্কোরলাইন নয়, মানসিক লড়াইয়েও পরিষ্কারভাবে এগিয়ে গেল। কটকে ১০১ রানে জয়, নিউ চ্যান্ডিগড়ে ৫১ রানে হার আর এখন ধর্মশালায় আত্মবিশ্বাসী প্রত্যাবর্তন—তিন ম্যাচে তিনরকম গল্পে সাজানো এই সিরিজ এখন ভারতের প্রয়োজনীয় টেম্পারামেন্ট–পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক মার্করামের লড়াকু ইনিংস এবং আগের ম্যাচগুলোর ব্যাটিং দাপট, তবে আজ তাদের মূল সমস্যা ছিল টপ–অর্ডারের ভঙ্গুরতা আর ভারতীয় পেসারদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক রুখে দাঁড়াতে না পারা। বিশ্বকাপের আগে দুই দলই এখান থেকে নিজেদের ভুল–ত্রুটি গুছিয়ে নিতে চাইবে, কিন্তু আজকের ম্যাচ শেষে ধর্মশালার পাহাড়ি বাতাসে স্পষ্ট একটা বার্তা ভেসে উঠল—যদি পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত আর নিখুঁত এক্সিকিউশন হয়, তবে এই ভারতীয় দলকে হারানো সহজ নয়।