ভুট্টা চাষ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কিভাবে করলে বেশি লাভ পাবেন?

Getting your Trinity Audio player ready...
সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

Apnarbangla Newsdesk: ভুট্টা এখন কৃষকের জন্য অন্যতম লাভজনক ফসল হিসেবে পরিচিত, কারণ পশুখাদ্য, খাদ্যদ্রব্য, তেল ও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ভুট্টার ব্যবহার দ্রুত বেড়ে চলেছে। সঠিক সময়ে বীজ বপন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, এবং রোগবালাই দমন করলে অল্প জমি থেকেও খুব ভালো ফলন(ভুট্টা চাষ শুরু থেকে শেষ) পাওয়া যায়, যা অনেক কৃষকের আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠছে।ভুট্টা শুধু মানুষের খাদ্য হিসেবেই নয়, গবাদিপশুর খাদ্য, পোল্ট্রি ফিড, স্টার্চ, তেলসহ নানা শিল্পজাত পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।  আবহাওয়া ও মাটির গঠন ভুট্টা উৎপাদনের জন্য অনুকূল হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভুট্টার আবাদ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অনেক এলাকায় এটি ধান ও গমের বিকল্প লাভজনক ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

ভুট্টা চাষের জন্য উপযুক্ত মাটি ও জলবায়ু

ভুট্টা একটি উপ‑উষ্ণমণ্ডলীয় ফসল হওয়ায় এটি সফলভাবে চাষ করা যায়। সাধারণত ১০°–৩০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং পর্যাপ্ত রোদ, হালকা শীত ও মাঝারি বৃষ্টিপাত ভুট্টা গজানো ও বেড়ে ওঠার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।ভুট্টা চাষের জন্য পানি না জমে এমন উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করা সবচেয়ে ভালো। হালকা বেলে দোআশ থেকে মাঝারি দোআশ মাটি ভুট্টা গাছের জন্য বেশি উপযোগী, তবে ভালো ড্রেনেজ থাকলে এঁটেল দোআশ মাটিতেও ফলন ভালো হতে পারে। মাটির pH সাধারণত ৫.৫–৭.০ হলে ভুট্টা গাছ সহজে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে এবং শিকড় শক্তভাবে গড়ে ওঠে।

​ভুট্টা চাষের মৌসুম ও ফসল পর্যায়ক্রম

ভুট্টা মূলত দুইটি প্রধান মৌসুমে বেশি চাষ হয়, রবি ভুট্টা ও গ্রীষ্মকালীন (খরিফ‑১) ভুট্টা। রবি মৌসুমে সাধারণত অক্টোবর–নভেম্বর মাসের মধ্যে বীজ বপন করা হয়, এই মৌসুমে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা অনুকূলে থাকায় ফলন তুলনামূলক বেশি হয়। গ্রীষ্মকালীন বা খরিফ মৌসুমে ফেব্রুয়ারি–মার্চ মাসে বীজ বপন করা যায়, তবে এই সময় অতিরিক্ত বৃষ্টি, গরম ও ঝড়ের প্রভাবের কারণে জমি ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে একটু বেশি নজর দিতে হয়।ফসল পর্যায়ক্রমে ধান বা গমের পর ভুট্টা এবং ভুট্টার পর ডাল বা সবজি চাষ করলে মাটির উর্বরতা দীর্ঘদিন বজায় থাকে। এভাবে ফসল ঘুরিয়ে চাষ করলে একই জমিতে এক ধরনের ফসল বারবার চাষের ফলে যে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের চাপ তৈরি হয় তা অনেকাংশে কমে যায় এবং মাটির গঠনও উন্নত থাকে।

​জমি প্রস্তুতি ও আগাছা পরিষ্কার

ভুট্টা গাছের শিকড় মাটির বেশ গভীর পর্যন্ত প্রসারিত হয়, তাই জমি ভালোভাবে ঝুরঝুরে ও গভীরভাবে চাষ করা জরুরি। সাধারণত ৩–৫ বার গভীর চাষ দিয়ে ৮–১০ ইঞ্চি পর্যন্ত মাটি উল্টে দিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে বলা হয় এবং প্রতিবার চাষের পর মই দিয়ে জমি সমান করা হয়। এতে জমিতে কোথাও পানি জমে থাকে না এবং শিকড়ের চলাচল ও বায়ুপ্রবাহ সহজ হয়।চাষের আগে ও মাঝে জমি থেকে আগাছা, আগের ফসলের অবশিষ্টাংশ, কচুরিপানা ইত্যাদি ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। জমি প্রস্তুতির শেষ চাষের সময়ই গোবর বা কম্পোস্টসহ মূল সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে সার গাছের শিকড়ের কাছে থাকে এবং পরবর্তীতে গাছ দ্রুত পুষ্টি পায়। যদি জমিতে খুব বেশি আগাছা থাকে, তাহলে প্রয়োজনে আগের মৌসুমে বা জমি তৈরির শুরুতে উপযুক্ত আগাছানাশক ব্যবহার করে আগাছার চাপ কমানো যায়।

আরো পড়ুন  আলু চাষে রেকর্ড ফলনের জন্য সার প্রয়োগ পদ্ধতি 2025
বীজ নির্বাচন, বপনের সময় ও দূরত্ব

ভালো ফলনের জন্য উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের বীজ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বীকৃত কোম্পানি বা সরকারি উৎস থেকে হাইব্রিড ও উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ করলে অঙ্কুরোদগম ভালো হয় এবং ফলনও বেশি পাওয়া যায়, পাশাপাশি অনেক জাতেই রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি থাকে।বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করা হলে বীজ পচা ও অঙ্কুর বের হওয়ার সময়ের রোগ অনেক কমে যায়। সাধারণত প্রতি কেজি বীজে নির্দিষ্ট মাত্রায় ছত্রাকনাশক মিশিয়ে বীজ ভালোভাবে মেখে নিয়ে ছায়ায় শুকিয়ে তারপর জমিতে বপন করতে বলা হয়। রবি মৌসুমে অক্টোবর–নভেম্বর এবং গ্রীষ্ম মৌসুমে ফেব্রুয়ারি–মার্চ মাসকে ভুট্টা বপনের উপযুক্ত সময় হিসেবে ধরা হয়, যদিও অঞ্চলভেদে কিছুটা তারতম্য থাকতে পারে।সারি ও দূরত্ব ঠিক রাখা ফলনের জন্য খুবই জরুরি। সারি থেকে সারি দূরত্ব ৫৫–৭৫ সেন্টিমিটার।গাছ থেকে গাছ দূরত্ব ২০–২৫ সেন্টিমিটার।বপনের গভীরতা ৩–৫ সেন্টিমিটার রাখা উত্তম।বীজ অঙ্কুরোদগমের পর যখন গাছ ৪–৬ পাতার হয়, তখন অতিরিক্ত চারা তুলে প্রতি স্থানে একটি করে সুস্থ গাছ রেখে দিলে গাছের ঘনত্ব আদর্শ থাকে এবং প্রতিটি গাছ পর্যাপ্ত পুষ্টি ও আলো পায়।

​ভুট্টা চাষে সেচ ব্যবস্থাপনা 

ভুট্টা ফসল অতিরিক্ত জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না, আবার পানি ঘাটতি হলেও ফলন কমে যায়, তাই সঠিক সময়ে ও সঠিক পরিমাণে সেচ দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।সাধারণভাবে ভুট্টার জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সেচ দিতে হয়।

  1. প্রথম সেচ: বীজ বপনের ১৫–২০ দিন পর, যখন গাছ ৪–৬ পাতার মতো হয়; এ সময় মাটির আর্দ্রতা ঠিক থাকলে গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে।
  2. দ্বিতীয় সেচ: প্রায় ৩০–৩৫ দিন বয়সে বা ৮–১২ পাতার পর্যায়ে, যখন গাছ দ্রুত বাড়ন্ত অবস্থায় থাকে এবং পুষ্টি গ্রহণ বেশি হয়।
  3. তৃতীয় সেচ: মোচা বের হওয়ার আগে বা সময়ে, কারণ এ পর্যায়ে পানি ঘাটতি হলে মোচায় দানা পরিমাণ ও ভরাট উভয়ই কমে যেতে পারে।
  4. চতুর্থ সেচ: দানা ভরাট ও শক্ত হওয়ার সময়, এই সেচ ফলন নির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

জমিতে যেন কোথাও অতিরিক্ত পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে, কারণ জলাবদ্ধতায় ভুট্টার শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গাছ হলদে হয়ে যেতে পারে। বেলে বা পানি দ্রুত নেমে যায় এমন মাটিতে সেচের বিরতি কম রাখতে হতে পারে, অপরদিকে ভারী মাটিতে সেচের সংখ্যা কমিয়েও আর্দ্রতা ধরে রাখা সম্ভব।

​ভুট্টা ফসলে সুষম সার ব্যবস্থাপনা

ভুট্টা একটি উচ্চ পুষ্টি গ্রহণকারী ফসল, তাই মাটি পরীক্ষা করে সুষম সার ব্যবস্থাপনা করা সবচেয়ে ভালো। সাধারণভাবে গোবর/জৈব সার, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ, গন্ধকসহ প্রয়োজনীয় সার সঠিক অনুপাতে ব্যবহার করা হলে গাছ সুস্থ থাকে এবং উচ্চ ফলন পাওয়া যায়।গোবর বা কম্পোস্টের পুরোটা এবং ফসফরাস, পটাশ ও গন্ধকের পুরো ডোজ মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়, সাথে ইউরিয়ার প্রায় এক তৃতীয়াংশ জমিতে দিয়ে চাষ করলে বেসাল সার হিসেবে কাজ করে। বাকি ইউরিয়া ২–৩ ধাপে উপরি প্রয়োগ করা হয়।

  1. প্রথম ভাগ: চারা ৬ পাতার সময়, হালকা নিড়ানি দিয়ে গাছের পাশে।
  2. ​দ্বিতীয় ভাগ: ৮–১০ পাতার সময় বা গাছ দ্রুত বাড়ার পর্যায়ে।
  3. ​তৃতীয় ভাগ (প্রয়োজন হলে): মোচা বের হওয়ার আগে, যাতে মোচা ও দানা ভরাট ভালো হয়।

উপরি সার দেওয়ার সময় সারির মাঝখান থেকে মাটি তুলে গাছের গোড়ায় তুলে দিলে গাছের শিকড়ের চারপাশে সার ছড়িয়ে যায় এবং গাছ মজবুত হয়। সুষম সার ব্যবহার না করলে গাছ অতিরিক্ত সবুজ ও নরম হতে পারে বা আবার পুষ্টির ঘাটতিতে খর্বাকৃতি হয়ে ফলন কমে যায়।

আরো পড়ুন  মিশ্র কৃষি: টেকসই উন্নয়নের একটি আধুনিক পদ্ধতি
​আগাছা দমন ও জমি পরিচর্যা

বপনের পর প্রথম ৩০–৪০ দিন ভুট্টার জমিতে আগাছা নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময় গাছ ছোট থাকে এবং আগাছার সঙ্গে পানি ও পুষ্টির প্রতিযোগিতা করতে পারে না। বপনের ১০–১৫ দিনের মধ্যে আগাছা বেশি হলে প্রথম নিড়ানি ও আগাছা পরিষ্কার করা উচিত, এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ১–২ বার নিড়ানি দিয়ে জমি আগাছামুক্ত রাখা দরকার।কিছু ক্ষেত্রে অনুমোদিত আগাছানাশক ব্যবহার করা যায়, তবে ডোজ, সময় ও নিরাপত্তা সম্পর্কে স্থানীয় কৃষি অফিস বা কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উত্তম। পাশাপাশি গাছ একটু বড় হলে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিলে গাছ আড়ষ্ট হওয়া এবং হেলে পড়া কমে, শিকড় মজবুত হয় এবং জমিতে পানি জমলেও গাছ তুলনামূলক নিরাপদ থাকে।

ভুট্টার রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন

ভুট্টা গাছে বীজ পচা, পাতার দাগ, ডগা পচা, কান্ড পচা ইত্যাদি রোগ এবং কিছু পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা যেতে পারে, যা ফলনকে বেশ প্রভাবিত করে। রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো রোগমুক্ত ও প্রতিরোধী জাতের বীজ নির্বাচন, বীজ শোধন, সুষম সার প্রয়োগ এবং অতিরিক্ত ঘন লাগানো এড়িয়ে চলা।রোগ দেখা দিলে ক্ষেত পর্যবেক্ষণ করে শুরুতেই ব্যবস্থা নিতে হবে, এতে ক্ষতি কম হয়। প্রয়োজনে অনুমোদিত মাত্রায় উপযুক্ত ছত্রাকনাশক বা কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে সবসময় লেবেলে লেখা নির্দেশনা ও কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলা নিরাপদ। আক্রান্ত গাছ ও মোচা জমি থেকে আলাদা করে নষ্ট করে দিলে রোগ ও পোকার বিস্তার অনেকাংশে কমানো যায়।

​ফলন বৃদ্ধি ও আধুনিক টিপস

ভালো ফলনের জন্য কেবল সার ও সেচ দিলেই হয় না, বরং সম্পূর্ণ প্যাকেজ হিসেবে সব ধাপ ঠিকমতো অনুসরণ করতে হবে। উচ্চ ফলনশীল জাত, সঠিক গাছের ঘনত্ব, সুষম সার, সময়মতো সেচ, আগাছা দমন ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে ভুট্টার ফলন নির্ধারিত হয়।প্রতি বিঘা জমিতে আদর্শ গাছের সংখ্যা সাধারণত ৮,০০০–৮,৫০০ এর মতো রাখা হয়, এতে প্রতিটি গাছ পর্যাপ্ত জায়গা, আলো ও পুষ্টি পায়। ফসল পর্যায়ক্রমে ডাল ও সবজি ফসলের সাথে ভুট্টা ঘুরিয়ে চাষ করলে মাটির জৈবগুণ ও গঠন ভালো থাকে এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার কিছুটা কমিয়েও ভালো ফলন বজায় রাখা যায়।

​ভুট্টা ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পদ্ধতি

ভুট্টা সাধারণত বপনের ৯০–১১০ দিনের মধ্যে জাত ও মৌসুমভেদে সংগ্রহের উপযোগী হয়, তবে ফসল তোলার সঠিক সময় বুঝে নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। মোচার বাইরের খোসা যখন শুকিয়ে বাদামী হয়, গাছের অধিকাংশ পাতা শুকিয়ে আসে এবং দানা শক্ত ও চকচকে হয়ে যায় তখন ভুট্টা সংগ্রহের উপযুক্ত সময় ধরা হয়।সঠিক সময়ে ফসল না তুললে অতিরিক্ত বৃষ্টি, ঝড় বা পাখি‑ইঁদুরের আক্রমণে মোচার অনেক ক্ষতি হতে পারে। ফসল সংগ্রহের পর মোচা বা ভুট্টার দানা রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে আর্দ্রতা নির্ধারিত সীমার নিচে নামিয়ে আনলে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় এবং ফাঙ্গাস বা পোকামাকড়ের আক্রমণও কম হয়।

Leave a Comment